Dhaka , শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
News Title :
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানের সাক্ষাৎ এসিসির সভায় যোগ দিতে কুয়েতে গেলেন বুলবুল নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর হুঁশিয়ারি – ‘ভোট ডাকাতি হলে মির্জা আব্বাসের রাজত্ব খানখান করে দিবো’ সেনাবাহিনীর ভূমিকা এখন পর্যন্ত প্রশংসনীয়: জামায়াত আমির ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করবে তিনটি বিষয়, বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা বেশি কুমিল্লা-৩; মুরাদনগরে টাকা বিতরণের অভিযোগে জামায়াতের নেতা আটক রাজধানীতে প্রশান্তি হাসপাতাল লিমিটেড–এ ডা. এস এম আব্দুল আলিম–এর চিকিৎসার আড়ালে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নতুন নাম ‘স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা ও সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মানা না হলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের

ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করবে তিনটি বিষয়, বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা বেশি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 21

আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এটিই প্রথম এমন নির্বাচন এবং দেশের ইতিহাসে প্রথমবার ব্যালটে থাকছে না আওয়ামী লীগ।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন যে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন, তা শুধু শাসকই বদল করেনি; বরং দেশের পুরো রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে দিয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট থেকে শুরু করে ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের মতো সাতটি প্রধান জাতীয় জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের পূর্বাভাস বলছে, অত্যাসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান ও অনিশ্চয়তা অনেকের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।

জরিপগুলোর তথ্য কী বলছে, কী আড়াল করছে এবং বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (এমন এক নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী হন। ভোটের ব্যবধান যা–ই হোক) নির্বাচনী ব্যবস্থা কেন সামান্য ভোটের ব্যবধানকেও আসনের বড় ব্যবধানে রূপান্তর করবে; সেটির একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো—

 

জরিপ ও তথ্যের ব্যবধান

হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিচালিত প্রতিটি জরিপেই জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বিএনপিকে এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে এ ব্যবধানের মাত্রা একেক জরিপে একেক রকম, যেমন ন্যারেটিভ/ আইআইএলডির জরিপে দুই দলের ব্যবধান মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ, আবার ইনোভিশনের সর্বশেষ প্যানেল স্টাডিতে বিএনপি ২১ দশমিক ৮ পয়েন্টে এগিয়ে।

জরিপের এই ভিন্নতা এলোমেলো কোনো বিষয় নয়। এটি মূলত ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির ফলাফল। ২৯৫টি আসনের ২২ হাজার ১৭৪ জন উত্তরদাতার ওপর করা ন্যারেটিভ কনসোর্টিয়ামের জরিপটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের চিত্র তুলে ধরেছে। অন্যদিকে ইনোভিশন আগে সাক্ষাৎকার নেওয়া ৫ হাজার ১৪৭ জনের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করেছে। ফলে সময়ের সঙ্গে জনমতের প্রকৃত পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এটি ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য পন্থা।

 

আওয়ামী লীগের বিরাট ভোটব্যাংক

এ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আওয়ামী লীগের ভোট। দলটি নিয়মিতভাবে মোট ভোটের ৩৫ থেকে ৪৮ শতাংশ পেয়ে আসছিল। এখন দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রায় ৪ কোটি ভোটারকে নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে হচ্ছে। সিআরএফ/ বিইপিওএস জরিপ অনুযায়ী, এই ভোটারের প্রায় অর্ধেকই বিএনপির দিকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক শক্তির এই বিশাল কাঠামোগত স্থানান্তরই বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিতে পারে।

তবে জামায়াতও এ ভোটব্যাংকের দ্বিতীয় সুবিধাভোগী। আওয়ামী লীগকে আগে যাঁরা ভোট দিতেন; তাঁদের প্রায় ৩০ শতাংশ বলছেন, তাঁরা একটি ইসলামপন্থী দলকে ভোট দেবেন। ইসলামপন্থী দলটিকে শেখ হাসিনার আমলে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তাঁদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেওয়া ও গুম করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান এর দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রতি বিএনপির কঠোর আচরণের কারণে তাঁরা জামায়াতকে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, কিছু আওয়ামী ভোটার হয়তো জামায়াতকে বেছে নিচ্ছেন হাসিনার সেই দাবিকে প্রমাণ করতে যে তিনি ছাড়া বাংলাদেশ একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

 

এফপিটিপি নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রভাব

বাংলাদেশের ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) নির্বাচনী ব্যবস্থা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারসাম্যহীন ব্যবস্থা। এখানে ৩০০টি একক নির্বাচনী এলাকায় যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী হন। এ ব্যবস্থা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দলকে কঠোরভাবে ‘শাস্তি’ দেয় এবং সুনির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত সমর্থনের চেয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমর্থনকে বেশি পুরস্কৃত করে।

২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য এর প্রভাব হবে অত্যন্ত প্রকট। ন্যারেটিভ জরিপের দাবি অনুযায়ী, যদি জাতীয়ভাবে জামায়াত বিএনপির চেয়ে মাত্র ৩-৫ শতাংশ ভোটে পিছিয়েও থাকে, তবু নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে আসনের ব্যবধান ৬০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হতে পারে। জামায়াতের ভোট মূলত উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নির্দিষ্ট ঘাঁটিতে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থন সারা দেশে সুষমভাবে ছড়িয়ে আছে; যা এফপিটিপি নির্বাচনী ব্যবস্থায় আসন জয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা।

জামায়াত কখনো সংসদে ১৮টির বেশি আসন পায়নি এবং তাদের ভোটের হার ১২ শতাংশ অতিক্রম করেনি। তাই বর্তমান জরিপগুলোতে তাদের ২৯-৩৪ শতাংশ সমর্থনের যে দাবি করা হচ্ছে, তা এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর অর্থ হলো, হয় বাংলাদেশে কোনো প্রকৃত ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ ঘটছে অথবা কিছু জরিপে জামায়াতের সমর্থনকে বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।

ফলাফল নির্ধারণ করবে তিন সমীকরণ

১. বিদ্রোহী প্রার্থী

বর্তমানে বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। দলের মনোনয়ন না পেয়ে ৯২ জন নেতা ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র বা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সাবেক সংসদ সদস্য বা জেলা পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতা।

অন্তত ৪৬টি আসনে এই বিদ্রোহীদের শক্তিশালী নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। নির্বাচনী পাটিগণিত খুব সহজ—যেখানে লড়াই শুধু বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে; সেখানে বিএনপি অনায়াসে জিতবে। কিন্তু যেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট ভাগ করবেন, সেখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সুযোগে মাত্র ৩৫ শতাংশ ভোট পেলেই জামায়াত জয়ী হতে পারে। গাণিতিক মডেল বলছে, এ বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপি ১৫ থেকে ৩০টি আসন হারাতে পারে।

২. তরুণ ভোটারের উপস্থিতি

জামায়াতের ছাত্রসংগঠন দেশের প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। প্রথমবার ভোট দেবেন, এমন তরুণদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশের পছন্দ জামায়াত। বর্তমানে মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশই জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম; সংখ্যায় যা প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ। যদি তরুণদের ভোট দেওয়ার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি হয়, তবে জামায়াতের আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আর এই তরুণ ভোটাররা যদি ভোটকেন্দ্রে না আসেন, তবে দলটির আসনসংখ্যা বড় ব্যবধানে কমে যাবে।

৩. অনিশ্চিত বা দোদুল্যমান ভোটার

প্রতিটি জরিপেই দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ উত্তরদাতা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি কিংবা তাঁদের পছন্দের কথা প্রকাশ করতে রাজি হননি। ন্যারেটিভের জরিপে ১৭ শতাংশ ভোটার এখনো দোদুল্যমান। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলকে বিশ্বাস করেন না। এই ভোটাররাই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। তাঁরা যদি সব দলের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়ে যান, তবে বিএনপির বর্তমান লিড বজায় থাকবে। কিন্তু তাঁরা যদি ২:১ অনুপাতে জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তবে ভোটের লড়াই তীব্র হয়ে উঠবে নাটকীয়ভাবে।

আসন পূর্বাভাস

—সংসদের আসন: ৩০০

—একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ১৫১

—বিএনপি ও জোট: ১৫৫–২১৫

—জামায়াত ও এনসিপি: ৫৫–১১০

—জাতীয় পার্টি: ৫–১৮

—ইসলামী আন্দোলন: ২–১০

—অন্যান্য/স্বতন্ত্র: ১০–৩৫

ভোটের গড় হার, ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট মডেল এবং বিদ্রোহী প্রার্থী ও ভোটার উপস্থিতির প্রভাব সমন্বয় করে এ পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে।

সবচেয়ে সম্ভাব্য আসনসংখ্যা (কেন্দ্রীয় প্রাক্কলন)

—বিএনপি ও জোট: ১৮৫

—জামায়াত ও এনসিপি: ৮০

—জাতীয় পার্টি: ১০

—ইসলামী আন্দোলন: ৫

—অন্যান্য/ স্বতন্ত্র: ২০

শেষ কথা

আমাদের (দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়াল কর্তৃপক্ষের) মূল পূর্বাভাস বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে দেশের পরবর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জন করতে পারে। তাদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা হতে পারে ৬০ থেকে ১০০টি। এর মাধ্যমে দলটি নিজেকে দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে; যা আগামী এক প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুন করে বদলে দেবে।

তবে নির্বাচনের গভীর অনিশ্চয়তা কে জিতবে তা নিয়ে নয়; বরং জয়ের ব্যবধান কতটা হবে, তা নিয়ে। বিএনপির ২১০-এর বেশি আসনের নিরঙ্কুশ সমর্থন আর ১৫৫ আসনের নড়বড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যবর্তী ব্যবধানটুকুই হলো বিশ্লেষণের প্রকৃত ক্ষেত্র। আর এটি নির্ধারিত হবে মূলত তিন নিয়ামকের ওপর; যা কোনো জরিপেই পুরোপুরি ধরা সম্ভব নয়। এ নিয়ামক হলো—১৭ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব ও জামায়াতের একনিষ্ঠ তরুণ ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে উপস্থিত হন কি না, সেই বিষয়।

বাংলাদেশের ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার এমন এক রায় দিতে যাচ্ছেন; যা আগামী এক প্রজন্মের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, পাল্লা বিএনপির দিকেই ভারী। তবে এ তথ্য-উপাত্ত একই সঙ্গে এ-ও বলছে, যেকোনো অভাবনীয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকুন।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানের সাক্ষাৎ

ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করবে তিনটি বিষয়, বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা বেশি

Update Time : ০৭:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের পর এটিই প্রথম এমন নির্বাচন এবং দেশের ইতিহাসে প্রথমবার ব্যালটে থাকছে না আওয়ামী লীগ।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন যে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন, তা শুধু শাসকই বদল করেনি; বরং দেশের পুরো রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে দিয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট থেকে শুরু করে ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের মতো সাতটি প্রধান জাতীয় জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের পূর্বাভাস বলছে, অত্যাসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। তবে ভোটের ব্যবধান ও অনিশ্চয়তা অনেকের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।

জরিপগুলোর তথ্য কী বলছে, কী আড়াল করছে এবং বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (এমন এক নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী হন। ভোটের ব্যবধান যা–ই হোক) নির্বাচনী ব্যবস্থা কেন সামান্য ভোটের ব্যবধানকেও আসনের বড় ব্যবধানে রূপান্তর করবে; সেটির একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো—

 

জরিপ ও তথ্যের ব্যবধান

হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিচালিত প্রতিটি জরিপেই জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বিএনপিকে এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে এ ব্যবধানের মাত্রা একেক জরিপে একেক রকম, যেমন ন্যারেটিভ/ আইআইএলডির জরিপে দুই দলের ব্যবধান মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ, আবার ইনোভিশনের সর্বশেষ প্যানেল স্টাডিতে বিএনপি ২১ দশমিক ৮ পয়েন্টে এগিয়ে।

জরিপের এই ভিন্নতা এলোমেলো কোনো বিষয় নয়। এটি মূলত ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির ফলাফল। ২৯৫টি আসনের ২২ হাজার ১৭৪ জন উত্তরদাতার ওপর করা ন্যারেটিভ কনসোর্টিয়ামের জরিপটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের চিত্র তুলে ধরেছে। অন্যদিকে ইনোভিশন আগে সাক্ষাৎকার নেওয়া ৫ হাজার ১৪৭ জনের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করেছে। ফলে সময়ের সঙ্গে জনমতের প্রকৃত পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এটি ছিল একমাত্র নির্ভরযোগ্য পন্থা।

 

আওয়ামী লীগের বিরাট ভোটব্যাংক

এ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আওয়ামী লীগের ভোট। দলটি নিয়মিতভাবে মোট ভোটের ৩৫ থেকে ৪৮ শতাংশ পেয়ে আসছিল। এখন দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রায় ৪ কোটি ভোটারকে নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে হচ্ছে। সিআরএফ/ বিইপিওএস জরিপ অনুযায়ী, এই ভোটারের প্রায় অর্ধেকই বিএনপির দিকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক শক্তির এই বিশাল কাঠামোগত স্থানান্তরই বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিতে পারে।

তবে জামায়াতও এ ভোটব্যাংকের দ্বিতীয় সুবিধাভোগী। আওয়ামী লীগকে আগে যাঁরা ভোট দিতেন; তাঁদের প্রায় ৩০ শতাংশ বলছেন, তাঁরা একটি ইসলামপন্থী দলকে ভোট দেবেন। ইসলামপন্থী দলটিকে শেখ হাসিনার আমলে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তাঁদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেওয়া ও গুম করা হয়েছিল। ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান এর দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রতি বিএনপির কঠোর আচরণের কারণে তাঁরা জামায়াতকে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, কিছু আওয়ামী ভোটার হয়তো জামায়াতকে বেছে নিচ্ছেন হাসিনার সেই দাবিকে প্রমাণ করতে যে তিনি ছাড়া বাংলাদেশ একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

 

এফপিটিপি নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রভাব

বাংলাদেশের ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) নির্বাচনী ব্যবস্থা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারসাম্যহীন ব্যবস্থা। এখানে ৩০০টি একক নির্বাচনী এলাকায় যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী হন। এ ব্যবস্থা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দলকে কঠোরভাবে ‘শাস্তি’ দেয় এবং সুনির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত সমর্থনের চেয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সমর্থনকে বেশি পুরস্কৃত করে।

২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য এর প্রভাব হবে অত্যন্ত প্রকট। ন্যারেটিভ জরিপের দাবি অনুযায়ী, যদি জাতীয়ভাবে জামায়াত বিএনপির চেয়ে মাত্র ৩-৫ শতাংশ ভোটে পিছিয়েও থাকে, তবু নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে আসনের ব্যবধান ৬০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হতে পারে। জামায়াতের ভোট মূলত উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নির্দিষ্ট ঘাঁটিতে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থন সারা দেশে সুষমভাবে ছড়িয়ে আছে; যা এফপিটিপি নির্বাচনী ব্যবস্থায় আসন জয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা।

জামায়াত কখনো সংসদে ১৮টির বেশি আসন পায়নি এবং তাদের ভোটের হার ১২ শতাংশ অতিক্রম করেনি। তাই বর্তমান জরিপগুলোতে তাদের ২৯-৩৪ শতাংশ সমর্থনের যে দাবি করা হচ্ছে, তা এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর অর্থ হলো, হয় বাংলাদেশে কোনো প্রকৃত ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ ঘটছে অথবা কিছু জরিপে জামায়াতের সমর্থনকে বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।

ফলাফল নির্ধারণ করবে তিন সমীকরণ

১. বিদ্রোহী প্রার্থী

বর্তমানে বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। দলের মনোনয়ন না পেয়ে ৯২ জন নেতা ৭৯টি নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র বা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সাবেক সংসদ সদস্য বা জেলা পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতা।

অন্তত ৪৬টি আসনে এই বিদ্রোহীদের শক্তিশালী নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। নির্বাচনী পাটিগণিত খুব সহজ—যেখানে লড়াই শুধু বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে; সেখানে বিএনপি অনায়াসে জিতবে। কিন্তু যেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট ভাগ করবেন, সেখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সুযোগে মাত্র ৩৫ শতাংশ ভোট পেলেই জামায়াত জয়ী হতে পারে। গাণিতিক মডেল বলছে, এ বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপি ১৫ থেকে ৩০টি আসন হারাতে পারে।

২. তরুণ ভোটারের উপস্থিতি

জামায়াতের ছাত্রসংগঠন দেশের প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। প্রথমবার ভোট দেবেন, এমন তরুণদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশের পছন্দ জামায়াত। বর্তমানে মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশই জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম; সংখ্যায় যা প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ। যদি তরুণদের ভোট দেওয়ার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি হয়, তবে জামায়াতের আসনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আর এই তরুণ ভোটাররা যদি ভোটকেন্দ্রে না আসেন, তবে দলটির আসনসংখ্যা বড় ব্যবধানে কমে যাবে।

৩. অনিশ্চিত বা দোদুল্যমান ভোটার

প্রতিটি জরিপেই দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ উত্তরদাতা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি কিংবা তাঁদের পছন্দের কথা প্রকাশ করতে রাজি হননি। ন্যারেটিভের জরিপে ১৭ শতাংশ ভোটার এখনো দোদুল্যমান। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলকে বিশ্বাস করেন না। এই ভোটাররাই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। তাঁরা যদি সব দলের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়ে যান, তবে বিএনপির বর্তমান লিড বজায় থাকবে। কিন্তু তাঁরা যদি ২:১ অনুপাতে জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তবে ভোটের লড়াই তীব্র হয়ে উঠবে নাটকীয়ভাবে।

আসন পূর্বাভাস

—সংসদের আসন: ৩০০

—একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ১৫১

—বিএনপি ও জোট: ১৫৫–২১৫

—জামায়াত ও এনসিপি: ৫৫–১১০

—জাতীয় পার্টি: ৫–১৮

—ইসলামী আন্দোলন: ২–১০

—অন্যান্য/স্বতন্ত্র: ১০–৩৫

ভোটের গড় হার, ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট মডেল এবং বিদ্রোহী প্রার্থী ও ভোটার উপস্থিতির প্রভাব সমন্বয় করে এ পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে।

সবচেয়ে সম্ভাব্য আসনসংখ্যা (কেন্দ্রীয় প্রাক্কলন)

—বিএনপি ও জোট: ১৮৫

—জামায়াত ও এনসিপি: ৮০

—জাতীয় পার্টি: ১০

—ইসলামী আন্দোলন: ৫

—অন্যান্য/ স্বতন্ত্র: ২০

শেষ কথা

আমাদের (দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়াল কর্তৃপক্ষের) মূল পূর্বাভাস বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রায় ১৮৫টি আসনে জয়ী হয়ে দেশের পরবর্তী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জন করতে পারে। তাদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা হতে পারে ৬০ থেকে ১০০টি। এর মাধ্যমে দলটি নিজেকে দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে; যা আগামী এক প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুন করে বদলে দেবে।

তবে নির্বাচনের গভীর অনিশ্চয়তা কে জিতবে তা নিয়ে নয়; বরং জয়ের ব্যবধান কতটা হবে, তা নিয়ে। বিএনপির ২১০-এর বেশি আসনের নিরঙ্কুশ সমর্থন আর ১৫৫ আসনের নড়বড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যবর্তী ব্যবধানটুকুই হলো বিশ্লেষণের প্রকৃত ক্ষেত্র। আর এটি নির্ধারিত হবে মূলত তিন নিয়ামকের ওপর; যা কোনো জরিপেই পুরোপুরি ধরা সম্ভব নয়। এ নিয়ামক হলো—১৭ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব ও জামায়াতের একনিষ্ঠ তরুণ ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে উপস্থিত হন কি না, সেই বিষয়।

বাংলাদেশের ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার এমন এক রায় দিতে যাচ্ছেন; যা আগামী এক প্রজন্মের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, পাল্লা বিএনপির দিকেই ভারী। তবে এ তথ্য-উপাত্ত একই সঙ্গে এ-ও বলছে, যেকোনো অভাবনীয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকুন।